ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬ ()

ধান সংগ্রহে ভুতুড়ে কৃষকের নাম

চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক তালিকায় অপ্রকৃত কৃষক, ধান ব্যবসায়ী ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ উঠতেই স্থগিত করা হয়েছে প্রস্তুতকৃত তালিকা। স্থানীয় একটি দৈনিকে ‘কৃষককে অন্ধকারে রেখে নেতাদের ধান বাণিজ্য’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। একই সঙ্গে উপজেলা বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আলোচনা।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহের জন্য প্রস্তুত করা তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের বদলে বিভিন্ন উপায়ে ধান ব্যবসায়ী ও অপ্রকৃত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর প্রশাসন নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিশেষ করে পৌর এলাকার কিছু নাম নিয়ে আপত্তি ওঠায় পুরো তালিকা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানে তালিকাভুক্ত কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্যেও দেখা গেছে অসঙ্গতি। সদর উপজেলার বটতৈল গ্রামের কৃষক সেলিম উদ্দিন জানান, তিনি মাত্র ১৫ কাঠা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৮ মণ ধান।

অথচ তালিকায় তার নামে ২ টন ধান সরবরাহের সক্ষমতা দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি সরকারি গুদামে কোনো ধান দিচ্ছি না। আমার নাম তালিকায় কীভাবে আসলো সেটাও জানি না।” একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন কৃষক। কেউ জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে কাগজপত্র জমা দেওয়া হলেও পরে তালিকায় নাম আছে কি না তা জানেন না। আবার কেউ দাবি করেছেন, তাদের অজান্তেই নাম ব্যবহার করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে এমন কিছু ব্যক্তির তথ্যও সামনে এসেছে, যারা কৃষিকাজের পাশাপাশি ধান ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

ফলে সরকারি কৃষক তালিকায় ব্যবসায়ীদের নাম কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো এ প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে। জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে কুষ্টিয়া জেলায় ৩ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় সংগ্রহের লক্ষ্য ১ হাজার ৩৮৩ মেট্রিক টন। এদিকে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা কৃষি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বিতর্কিত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রূপালী খাতুনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুসরণ করেই তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বিতর্কিত বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন।

বিতর্কের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃত কৃষক যেন সরকারি সুবিধা পান। তালিকায় কোনো ধরনের অসঙ্গতি থাকলে তা অবশ্যই সংশোধন করা হবে। এজন্য নতুন করে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, পৌর এলাকার কিছু অসঙ্গতি নজরে এসেছে। এমন কিছু এলাকার মানুষের নাম তালিকায় পাওয়া গেছে, যেখানে প্রকৃতপক্ষে কৃষক থাকার কথা নয়। তাই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তালিকাটি পুনরায় যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ২০১২ সালের পর নতুন কৃষক কার্ড ইস্যু না হওয়ায় বাস্তবে কৃষিকাজে যুক্ত নতুন অনেক কৃষকের কার্ড নেই।

এ কারণে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার প্রত্যয়নের ভিত্তিতে প্রকৃত কৃষকদের তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত। তিনি দাবি করেন, ধান সংগ্রহের তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং খাদ্য বিভাগ ও কৃষি অফিস জানিয়েছে—তালিকা প্রস্তুতের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিপ্লব বলেন, “আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে আমি আর্থিক অনিয়ম বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।

আমি ব্যবসা করি, রাজনীতি পেশা নয় শখ থেকে করি।” তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের দুঃসময়ে রাজপথে থাকা নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের পক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছেন। এ ব্যাপারে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন মুরাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।


     এই বিভাগের আরো খবর